সীজন অফ ওয়েডিং, অফ-সীজন ওয়েডিং

প্রকৃতির চরিত্র পরিবর্তনের অন্যতম প্রকাশ মৌসুম বা ঋতু. এই মৌসুমের পরিবর্তনে পাল্টে যায় পরিবেশ, আবহাওয়া, খাবার, পোশাক-আশাক মিলিয়ে জীবনযাত্রার প্রায় সব কিছুই. তবে প্রকৃতির এই মৌসুম ছাড়াও আমাদের লাইফ স্টাইলের ক্যালেন্ডারে রয়েছে আরো বেশ কয়েকটি মৌসুম. যেমন ধরুন ঈদ মৌসুম বা বিয়ের মৌসুম. এই মৌসুম গুলো আসলে যতটুকু প্রকৃতি দ্বারা প্রভাবিত, তার চেয়ে বেশি সময় এবং অভ্যস্ততা দ্বারা নিয়ন্ত্রিত. তাই এই মৌসুম গুলোকে ঘিরে পরিকল্পনা গুলোতে প্রকৃতির সাথে দ্বন্দ থাকলেও অভ্যস্ততার কারণে তা মেনে  নিতে হয় অনুষ্ঠানগুলোতে অংশগ্রহণকারী সবাইকেই. অবশ্য এমনটি হরহামেশাই হয়ে থাকে বিনোদনধর্মী চলচ্চিত্র গুলোতেও. যেখানে তুন্দ্রা অঞ্চলের মনোরম লোকেশনে অভিনেত্রীদের দেখা যায় হট-প্যান্ট আর টর্ন টি শার্ট পরে রক এন্ড রোল করতে, বা মরুভূমিতে একশন হিরোকে দেখা যায় ভার্সাচি সুট পরে হিরোইনের সাথে খুনসুটি করতে. আমরা অবশ্য অভ্যস্ততার কারণেই মেনে নেই. কারণ নায়ক-নায়িকার পোশাক তো এমনি হবে. এই অভ্যস্ততার কারণেই আবহাওয়ার থার্মোমিটারে সর্বোচ্চ তাপমাত্রার সময়েও বিয়ে বাড়িতে বসে গরুর মাংশ চিবুতে চিবুতে ভাবি, বাহ এই না হলে বিয়ে বাড়ির খানা. আবার পারদ হিমাঙ্কের নিচে থাকা সময়ের বিয়েতে এয়ার কন্ডিশন কনভেনশন সেন্টারে গিয়ে স্লিভলেস ব্লাউজের প্রশংসাও শুনি হালকা কেপে কেপে. আর রাতের ঠান্ডা-জ্বর? সেতো হাই ফ্যাশনের অপরচুনিটি কস্ট. আমাদের এমন বিচিত্র মজার অভ্যাস এবং সঠিক পরিকল্পনার অনভ্যাস নিয়েই কিন্তু বেশ চলে যাচ্ছে. আর আমরাও অভ্যস্ত এই মনোভাব নিয়ে যে, ‘চলছে তো…চলুক’.
বিয়ে-সাদির ব্যাপারে আমাদের সংখ্যা গরিষ্ট সাধারণ উপযুক্ত মৌসুম মনে করেন শীতকে. আর তাই অক্টোবর থেকে ফেব্রুয়ারী পর্যন্ত সময়টিকে ধরা হয় ব্রাইডাল সিজন হিসেবে. অবশ্য অফ সিজনে যে বিয়ে হয়না এমন নয়. তবে সংখ্যায় কম. কিন্তু বেশ উচ্চবিত্ত এবং সৃজনশীল সৌখিন মানুষদের বিয়ের অনুষ্ঠান গুলো ছাড়া বেশির ভাগ বিয়ের অনুষ্ঠানগুলোই হয় গতানুগতিক আয়োজন নিয়ে. কিন্তু একটু সচেতন ভাবে পরিকল্পনা গুলো করলেই কিন্তু অনুষ্ঠান গুলো হয় আরামপ্রদ এবং সুবিধাজনক. কিন্তু কিভাবে করবেন একটি ফ্ললেস ব্রাইডাল ইভেন্ট? কয়েকটি কি পয়েন্টে নজর রাখলেই তা সম্ভব.
ফুড ম্যেনু: সিজন হোক বা অফ সিজন হোক, বিয়েতে ভরপুর ভুরিভোজ হবে এটাই স্বাভাবিক. কিন্তু তার পাশাপাশি আমন্ত্রিত অতিথিদের স্বাস্থের ব্যাপারে খেয়াল রাখাটাও বাঞ্চনীয়. তাই বিয়ের ফুড ম্যেনু নির্বাচনের সময় খেয়াল রাখবেন বিয়ের সময় আসলে আবহাওয়া কেমন থাকবে? এবং সেই আবহাওয়ার কারণে কি ধরনের খাদ্যাভাস হতে পারে আমন্ত্রিত অতিথিদের. অভ্যস্ততার বশবর্তী হয়ে তালিকায় রিচ ফুডের উল্ল্যেখ করলেও চেষ্টা করুন একটু মৌসুমী সবজি জাতীয় আইটেম এবং সহজপাচ্য রেসিপি রাখার. এতে করে হেভিওয়েট ডাইনিং হলেও শরীর সচেতন সবাই নিজের মত খাবার পছন্দ করতে পারবেন. যেমন প্রচন্ড গ্রীষ্মের সময়ে অতিরিক্ত তৈলাক্ত খাবার একটু এড়িয়ে চলায় ভালো. আবার বর্ষার সময় মাছ ঢুকিয়ে দেয়া যেতে পারে গরু-খাসির বদলে. আবার বর্ষার সময় একটু ভাজা ভুজি রাখতে পারেন ব্রাইডাল ম্যেনুতে. এমনকি শরবত মেন্যুতেও মৌসুমী ফলফলাদির রস সংযুক্ত করা যেতে পারে একটু নতুনত্ব আনার জন্যে. এছাড়াও বরের টেবলের আস্ত রোস্ট দেয়ার ব্যবস্থা করলে সেটিও কিন্তু কতটুকু অংশ হাফ কুকড এবং কতটুকু ওভার কুকড তা নজর রাখা জরুরি. এমনকি মৌসুম বুঝে মজার মজার সালাদ আইটেমও বিয়ের সুপার রিচ খানা হজম করতে হতে পারে সহায়ক. আসলে খাবার-দাবারের ব্যাপারে শুধু প্রয়োজন স্বাস্থ্য সচেতনতা এবং রসনা বিলাসী. তাহলেই মৌসুম অনুযায়ী ফুড প্ল্যানিং করা যেতে পারে বিয়ের আসরের জন্যে. হাজার হোক বিয়ের খানা বলে কথা.
ওয়েরড্রব: শুধু কি ঝলমল করলেই হবে? ফাংশনালিটির দিকগুলো ভেবে পোশাক নির্বাচন করুন. বিয়ে উপলক্ষে বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই ভারী পোশাকের দিকেই পাল্লা ঝুকে যায়. কিন্তু তা কি সব মৌসুমেই আরামদায়ক কি না আবার ফ্যাব্রিকটি ত্বকবান্ধব কিনা তা বোঝার দায়িত্ব কিন্তু যারা পোশাক নির্বাচন করেন এবং যারা পোশাকটি পরে পুরো বিয়ের অনুষ্ঠানটিতে অংশগ্রহন করেন তাদের উপরই থাকে. এমন কিন্তু কখনই নয় যে গরমের জন্যে হালকা ফ্যাব্রিক দিয়ে বিয়ের পোশাক তৈরী করা যায় না. তবে এক্ষেত্রে দরকার হয় শুধু একটু সময় আর যথাযথ পরিকল্পনা. অথবা গতানুগতিক সব বিয়ের মতই আপনাকেও সাড়ে ১২ কেজি ওজনের শাড়ি-লেহেঙ্গা পরে অনুষ্ঠান শেষ হবার আগেই ঘেমে নেয়ে সব কিছু ঘামাঞ্জলি দিয়ে দিতে হবে. বরের পোশাক এবং বরযাত্রীর সুট-বুটের ক্ষেত্রেও অনেকটা একই সূত্র. বিশেষ করে গরমের দিনগুলোতে ভারিক্কি ডিজাইনের শেরওয়ানির চাপে বরের অবস্থা মাঝে মাঝেই হয়ে ওঠে গলদঘর্ম. আবার হলুদের পোশাকের ক্ষেত্রে অনেকেই গ্রীষ্ম কালে বেছে নেন সিল্ক বা সম জাতীয় ফ্যাব্রিক. এবং হলুদের হৈ হুল্লোর আর কাজ কর্ম করতে করতেই ফ্যামিলি পিকচারে দেখা যায় প্রায় সবারই পাঞ্জাবি ঘেমে লেগে আছে গায়ের সাথে. তাই বিয়ের অনুষ্ঠানের সময় নির্বাচন হবার সাথেই সাথেই সেই মৌসুম অনুযায়ী ফ্যাব্রিক এবং অর্নামেনটেশন ডেনসিটি বাড়িয়ে-কমিয়ে পোশাক নির্বাচন করুন. পাশাপাশি গয়নার ব্যাপারটিও মাথায় রাখতে হবে. কারণ পোশাকের ফ্যাব্রিকের মতই গয়নাও অনেক সময় ত্বকের ক্ষতির কারণ বা অস্বস্তিকর হতে পারে. তাই এসব ডিটেইলিংএর দিকে নজর রাখুন. আর একান্তই না পেরে উঠলে অভ্যস্ততার অজুহাত তো আছেই.
মেকওভার: প্রতিষ্ঠিত এবং প্রশিক্ষিত মেকওভার সালনগুলো ছাড়া এখনো বিয়ের মেকাপ মানেই ত্বকের ওপর রূপের পরত. তাও কিনা আবার যথেচ্ছা ফাউন্ডেশন এবং পাউডারের তৈরী. অল থ্রু দা সিজন ক্ষতির পাশাপাশি ভুল মৌসুমে ভুল মেকওভার এবং বিউটি প্রডাক্ট ব্যবহার আপনার ত্বকের জন্যে বয়ে নিয়ে আসতে পারে বিশেষ বিপর্যয়. গ্রীষ্মকালে যেমন অয়েল বেসড মেকাপ এবং প্রডাক্ট ব্যবহার করলে বিয়ের পরদিন থেকেই আপনার ত্বক হয়ে উঠতে পারে দানাদার. এছাড়াও গ্রীষ্মকালে প্যানকেকের বদলে অতিমাত্রায় ফাউন্ডেসনের অতিমাত্রায় ব্যবহারে ত্বকের অনেক ধরনের ক্ষতি হতে পারে. এবং গরমের দিনে ওয়াটার বেসড মেকাপের বদলে অয়েল বেসড মেকাপ ব্যবহারের সবচাইতে বড় ঝুকি অনুষ্ঠান শেষ হবার আগেই গরমে মেকাপ গলে যাওয়া বা ছড়িয়ে যাওয়া. এমনকি শীতের সময়ও রুক্ষ ত্বকের ওপর মেকাপ সঠিক ভাবে না বসলে কিছু না কিছু বেগতিক ঘটে যেতে পারে. এছাড়াও শীতের সময় যেমন মেকাপ রিমুভিন্গের ক্ষেত্রে একটু বেশি ময়শ্চারাইজার ব্যবহার করা ভালো ঠিক তেমনি গরমের সময় মেকাপ রিমুভিন্গের ক্ষেত্রে ওয়াটার বেসড প্রডাক্ট ব্যবহার করা তা ভালো. চুল বাধা এবং চুল খোলার ক্ষেত্রেও এই পরামর্শ এবং সচেতনতা গুলো একটু মেনে চলতে হবে. মৌসুমের ওপর নির্ভর করে তাই নির্ণয় করতে হয় রূপচর্চার যেকোনো পন্থা.
হেলথ: যেমন ত্বকের সংবেদনশীলতা ঠিক তেমনি আপনার স্বাস্থ্যও ঋতু বৈচিত্রের উপর নির্ভর করে হয়ে ওঠে অনুভুতিপ্রবন. এবং বিয়ের যজ্ঞে সবচেয়ে বেশি যা পোড়ানো হয় তা হলো আপনার স্বাস্থ্য. তাই মৌসুম অনুযায়ী খেয়াল রাখুন নিজের প্রতি নিজের বিয়ের দিনগুলোতে. শীতে যাদের ডাস্ট এলার্জি বা এস্থেমার সমস্যা হয় তাদের জন্যে দরকার বাড়তি সচেতনতা. আবার অতিরিক্ত গরমের কারণে হিট স্ট্রোক করে কনে মূর্ছা গেলে কিন্তু ভাববেন না যে পিতৃকুল ছেড়ে যাবার শোকে এই ঘটনা. তাই গ্রীষ্মকালের এইসব উপসর্গ বা স্বাস্থ্যগত সম্ভাব্য জরুরি অবস্থা যাতে না আসে, সেই দিকে নজর রাখুন. এছাড়াও মৌসুম পরিবর্তন এবং বিয়ের ঝক্কি-ঝামেলার মাঝখানে সচেতন থাকুন স্বাস্থের প্রতি.
এসব কিছু ছাড়াও বিয়ে আয়োজনের প্রায় সবগুলো দিকই কিছুটা হলেও মৌসুম নির্ভর করে পরিকল্পনা করাটা সম্ভব. এবং তা আপনার জন্যে সবসময়ই ভালো ফলাফল বয়ে নিয়ে আসবে. জীবনের সবচেয়ে আকর্ষনীয় উত্সবের মৌসুমে উত্ফুল্ল থাকুন. আর জীবনসঙ্গীকে সব মৌসুমেই সমান ভালোবাসুন.

ওয়েডিং ফ্যাশন

ব্যক্তিজীবনের সবচাইতে বড় উত্সব ‘বিয়ে’র পোশাক আয়োজনকে ঘিরে সবারই রয়েছে নানাবিধ চিন্তাভাবনা. তবে এর সিংহভাগই আবর্তিত হয় পোশাক পরিধানের অর্থমূল্য আর আভিজাত্য প্রদর্শনীকে ঘিরে. তবে এর পাশাপাশি পোশাকটি সঠিকরূপে উপস্থাপন করার কৌশলের অভাবে কিন্তু ভেস্তে যেতে পারে পোশাক আয়োজনের সব চাল. মানব সভ্যতায়  পোশাক পরিধানের সর্ব প্রথম উদ্দেশ্য সফলতা লাভ করে যখন তা মানবজাতিকে মুক্ত করে লজ্জা নিবারণের দায় থেকে. ধীরে ধীরে পোশাক চলে আসে মৌলিক চাহিদার তালিকার দ্বিতীয় স্থানে. আর আজকের যুগে পোশাক পরিধানের রীতিনীতি নির্ধারণের জন্য অবতরন হয়েছে নতুন ধারার. যার নাম ফ্যাশন. প্রশ্ন জগতে পারে, কাপড় পরার জন্য আবার নিয়ম নীতিমালার কি প্রয়োজন? কিন্তু কাবুলী সালওয়ার এর সাথে ফুল স্লিভ ফর্মাল শার্ট পরে একদিন বাইরে বেরুলেই বুঝতে পারবেন কেন এই নিয়ম নীতি. ঠিক তেমনি বিয়ের পোশাকের ক্ষেত্রে অনেকেই করে বসেন এমন অসামঞ্জস্যতাপূর্ণ ভুল. আসলে এগুলোকে ভুল বললে খানিক ভুলই হবে. বরং উত্সব আয়োজনে এগুলোকে বলা যেতে পারে বেখেয়ালী. আর সচরাচর বিয়ের পোশাকের ক্ষেত্রে পাত্র-পাত্রীর চিন্তাভাবনার চেয়ে অভিভাবকদের সিদ্বান্তই একটু বেশিই  গুরুত্ব পেয়ে থাকে. আর এই পরিপ্রেক্ষিতে খুবই স্বাভাবিক প্রক্রিয়াতে (প্রজন্ম ঘটিত দুরত্ব) বরের ‘সুপার সফিস্টিক’ ব্যক্তিত্বের সাথে যোগ হয় ম্যাচিং জরি-চুমকি দেয়া চুনরি আর ঝালরওয়ালা পাগড়ি. অথচ একটু খেয়াল করলেই কন্ট্রাস্ট ম্যাচ করা একরঙা হাতে বাধা পাগড়ি আর ডাবল লেয়ার টিস্যু চুনরি এনে দিতে পারত বরের পোশাকে সিম্পলিসিটি আর সোবারনেস. এসব অনেক কিছু মিলেই আসলে পোশাকে আসে পরিপূর্ণতা. আর জীবনের সবচেয়ে বড় আয়োজনের দিনে যদি পোশাক পূর্ণাঙ্গতা না পায়, অপরপক্ষ থেকে যে মধুর কটুক্তি আসবেনা এ নিশ্চয়তাও কে দেবে বলুন.

পোশাক পরার ক্ষেত্রে সবচাইতে মুখ্য উদ্দেশ্য হিসেবে মোটামুটি সবাই বিবেচনা করেন নিজস্ব ফ্যাশন স্টেটমেন্টর প্রকাশ ঘটানো. আর তা যদি হয় নিজের বিয়ের আসর তাহলে তো কথাই নেই. তবে এই স্টেটমেন্ট প্রকাশের ক্ষেত্রে নিজের দৈহিক গড়ন, গায়ের রং, উচ্চতা, ব্যক্তিত্ব ইত্যাদি সবকিছুকে মাথায় রেখে পোশাক নির্বাচন করাটা খুবই জরুরি. বিশেষ করে বিয়ের পোশাক গুলোর ক্ষেত্রে আরামের দিকটি বিবেচনা করে আউটফিট গুলো পছন্দ করা উচিত. কারণ বিয়ের প্রতিটি অনুষ্ঠানেই বর বা বধুকে বেশ অনেক সময় ধরেই বসে থাকতে হয়. আর এমতাবস্থায় যদি পোশাকটি আরামপ্রদ না হয় তাহলে বিয়ের অনুষ্ঠানের অভিজ্ঞতা মোটেই পারফেক্টলি প্লেস্যান্ট হবেনা. যেমন হলুদের পোশাকের কথাই ধরা যাক, হলুদ মানেই গায়ে হলুদ মাখা তো আছেই, উত্সবের উত্তেজনায় আজকাল স্টেজএ থাকা কেকএর ক্রিম ও চলে আসে বর বা বধুর গালে (ক্ষেত্র বিশেষে পোশাকেও). তাই হলুদের পোশাকের ক্ষেত্রে খুব জমকালো পোশাক না নির্বাচন করাই ভালো. আর রং এর ক্ষেত্রে হলুদের রং লেগে গেলেও তা যাতে ক্যামোফ্লেজ হয়ে থাকে এমন রং নির্বাচন করা উচিত. আরামের ব্যাপারটিত মাথায় থাকতেই হবে, যেহেতু হলুদের পিরিতে ঘন্টার পর ঘন্টা বর বা বধুকে বসে থাকতে হয়. তবে এক্ষেত্রে ব্যাপারটি একটু সহজ হয়ে যায় যদি মৌসুম কে মাথায় রেখে পোশাকের ফাব্রিক নির্বাচন করা সম্ভব হয়. নতুবা প্রচন্ড গরমে মোটা ফেব্রিক পরে ঘেমে নেয়ে ওঠার মত পরিস্থিতির শিকার হতে হবে অথবা হিম শীতলে আবহাওয়াএ পাতলা ফ্যাব্রিকের কাপড় পরে শ্বশুর বাড়ির লোকদের সামনে কাঁপতে হবে. বরের হলুদের পোশাকের ক্ষেত্রে একটু ঢিলেঢালা গোছের পাঞ্জাবি অথবা শর্ত কুর্তা হতে পারে আদর্শ পোশাক. সাথে মানানসই সালওয়ার. যারা একটু স্বাস্থ্যবান তারা কাবুলী সালওয়ার পড়তে পারেন সাথে একটু লুস ফিট কুর্তা বা পাঞ্জাবি. চুনরি বা ওরনা আসলে হলুদের ক্ষেত্রে একটু ঝামেলার অবতরণ করতেও পারে. তাও যদি আপনি নিজে ম্যানেজ করে নিতে পারেন তাহলে তো কথাই নেই. মেয়েদের ক্ষেত্রে সাধারণত এক প্যাচ এ শাড়ি পরার একটা চল আমাদের দেশে রয়েছে. তবে এক্ষেত্রে ইজি মেইন্টেনেনস এর জন্য ফ্যাব্রিক খুবই জরুরি একটা ফ্যাক্টর. হাফ সিল্ক বা মার্সেরায়জ্দ কটন খুবই চমত্কার সমাধান হতে পারে. তাহলে আপনার শাড়ি ফুলে থাকবেনা. আর যারা নতুনত্ব আনতে সালওয়ার-কামিজ পড়তে চান তাদের জন্যও রয়েছে পছন্দসই কাপড় বেছে নিয়ার সুযোগ. আর শাড়ির তুলনায় সালওয়ার-কামিজ বেশি ফ্লেক্সিবল, তাই হঠাত উঠে নাচানাচি শুরু করে দিলেও খুব একটা সমস্যাএ পড়তে হবেনা. হলুদে সচরাচর ফুলের গহনার জনপ্রিয়তা এখন তুঙ্গে. কিন্তু পোশাকের সাথে ম্যাচিং করে গহনা গুলো কেনা উচিত. তবে খেয়াল রাখতে হবে যাতে আলগা কাঁটা বা তার না থাকে.

একটু আনন্দময় হলুদের পরেই বিয়ের দিনটি চলে আসে. তবে এক্ষেত্রে বরের পোশাকের ব্যাপারে স্বয়ং বর খুব একটা মাথা ঘামাতে পারেন না. কারণ পোশাক আসে কনের বাড়ি থেকে. তবে আজকাল এই নিয়মের বেশ বিবর্তন দেখা যাচ্ছে. তাই যদি সুযোগ থাকে তাহলে এই যুগের নওশেররা অতিরিক্ত চুমকীয়ালা শেরওয়ানি বা পাঞ্জাবি এড়িয়ে যেতে পারেন. কারণ আমাদের দেশের গতানুগতিক বিয়ের শেরওয়ানি গুলো হয় এক ছাট এর. যা বসার সময় সামনের অংশ ফাক হয়ে যায়. কিন্তু শেরওয়ানিটি একটু ঘেরওয়ালা হলেই এই ঘটনা থেকে সহজেই মুক্তি পাওয়া সম্ভব. সাথে চুরিদার(শেরওয়ানি হলে অবশ্যই চুরিদার) বা সালওয়ার বাছাই করা উচিত একই রং এর. খেয়াল রাখবেন যাতে পকেট ও জিপারওয়ালা পায়জামা হয়. নতুবা জরুরি সময় জরুরি অবস্থার সম্মুখীন হতে হবে. যদিও আমাদের দেশের বরের পোশাক হিসেবে চুরিদার আর চুমকীয়ালা শেরওয়ানি প্রথা হয়ে যাচ্ছে কিন্তু বেশিরভাগ সময় অনেকেই খেয়াল করেন না যে নিজের সাইজ থেকে অন্তত দুই সাইজ বড় শেরওয়ানিতে আসলে কেমন লাগছে. তবে এর একমাত্র সমাধান কাস্টমাইজদ ফিটিং. যদি নিজের পছন্দ মতন বানানো হয় তাহলে তো কথাই নেই. অথবা আপনি কোনো ফ্যাশন স্টোর থেকে কিনে অল্টার করে নিতে পারেন অনায়াসেই. এর সাথে যদি কেউ চুনরি বা ওরনা ব্যবহার করতে চান একসেসরিস হিসেবে তাহলে টিস্যু এবং কন্ট্রাস্ট রং ব্যবহার করতে পারেন. আর শ্যালক শ্যালিকার টার্গেট থাকে যেই জুতোর প্রতি, অনেকে নিজের সুবিধার্থে তা পরেন মুজা দিয়ে. ব্যাপারটি সহনশীল হলেও চোখে যে একদম ই লাগেনা এমন নয়. আসলে নাগরার মত এক খানা রাজসিক জুতা কখনো মুজা দিয়ে পরা উচিত নয়. যাই হোক সব শেষে আসে বরের পাগড়ির কথা. আমাদের দেশের গতানুগতিক (এলিফ্যান্ট রোড কেন্দ্রিক ব্রাইডাল স্টোর গুলোতে সহজলভ্য) যেসব পাগড়ি পাওয়া যায় তা খুব কম সময় ই বরের মাথায় পারফেক্ট ফিট হয়ে থাকে. হয় শশুর মশায় কে সালাম করতে গিয়ে তা খুলে আসার উপক্রম হয় অথবা তা এত টাইট থাকে যে বাসর রাতে নব বধুকে মাথা মালিশ করে দিতে হয়. এই ঝামেলা এড়ানোর সবচেয়ে সহজ পন্থা হলো হাতে বাধা পাগড়ি পরা. একাধারে টা আপনার মাথায় ফিট হবে ঠিক তেমনি আপনার স্টাইল স্টেটমেন্ট কে নিয়ে যাবে হিরোইক  পর্যায়ে.

বিয়ের কনের পোশাকের ক্ষেত্রে আলোচনা আসলে খুবই সংবেদনশীল একটা ব্যাপার. শাড়ির পাশাপাশি আজকাল অনেকেই লেহেঙ্গা বা ঘারারা পরে থাকেন. তবে গহনার আতিশয্য সবসময় ই কনের পোশাকের উপরি অংশ আবৃত করে রাখে. ঘটনা টি ‘unavoidable’. কিন্তু গহনার ম্যাচিং এর ব্যাপারটির চেয়ে বেশিরভাগ সময়ই আতিশয্যই প্রাধান্য পায়. যাই হোক, গহনার ক্ষেত্রে এর নন টক্সিসিটির ব্যাপারটিও বেশ গুরুত্বপূর্ণ. তবে কনের পোশাকের ক্ষেত্রে সবচেয়ে মুখ্য বিষয়টি হচ্ছে পোশাকের ফিটিং. এক্ষেত্রে ট্রায়াল দেয়া ছাড়া আর কোনই বিকল্প নেই. আর সবচেয়ে রিস্ক ফ্রী কাজ হচ্ছে কনের মাপ নিয়ে পোশাকটি বানানো.

পোশাক তৈরির সাথে সাথে এর প্রেসেন্টেশনও একটি অবশ্য লক্ষ্যনীয় ব্যাপার. অনেক গর্জিয়াস একটি পোশাক ও নেহাত পরিবেশনের দোষে সস্তা (সৃজনশীলতা বিচারে) মনে হতে পারে. তাই সঠিক পরিবেশন কল্পে খেয়াল রাখতে হবে যেন ম্যাচিং এর আতিশয্য যেন না হয়ে যায়. যেমন লেহেঙ্গা বা করসেট টপস অথবা চোলির ক্ষেত্রে এমন ফ্ল্যাশি কিছু পরবেন না যাতে আপনার গহনার ঔজ্জল্য পোশাকের আড়ালে ঢেকে যায়. পোশাকের ওজনের ব্যাপারটিও বিয়ের দিনকার জন্য খুবই উদ্বিগ্নতার দাবিদার. অথচ হালকা ফ্যাব্রিকের পোশাক বিয়ের দিনটিতে আপনাকে এনে দিতে পারে সাচ্ছন্দ্য.

পোশাক বির্বাচন এবং তা পরিবেশনের মাধ্যমেই প্রকাশ পায় আপনার ব্যক্তিত্ব আর রুচির বৈচিত্রের. আর বিয়ের মতন আনুষ্ঠানিকতা যাতে সর্বদা স্মরণীয় থাকে তার জন্যে এই দুটি বিষয়ের দিকে লক্ষ্য রাখার দ্বিতীয় কোনো অপশন পাওয়া দুষ্কর.

 

 

নুরুল আফসার রাজ

 

আ ওয়াক টু রিমেম্বার

বিবাহ প্রথার প্রচলনের সময় থেকেই ব্যাঙ্গাত্মক তুলনাটি চলে আসছে. একটু বেশি সাজগোজ করলেই পরিচিতমহলের অনেকেই খোচা দিয়ে জানতে চায় আজকে কি বিয়ে নাকি? অথবা প্রশংসার মিছরি ছোরা আসে এভাবে যে, আজকে নাকি একদম জামাইয়ের মতন লাগছে. সুতরাং প্রবণতা গণিতের ফলাফল আসে যে পরিনয় যজ্ঞ সম্পাদনে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হচ্ছে ‘সাজপোশাক’. তাই যেখানে শুধু আয়োজন আর প্রয়োজনের খরচের খতিয়ান বিয়ের সংশ্লিষ্ট অর্থনীতির গ্রাফকে উস্কে দিচ্ছে, সেখানে কনের বেনারসী আর নওশের আংরাখার ক্যাশ মেমোর অংশগ্রহন, ইটস এ মাস্ট. আর সাথে ভ্যালু এডিশনের জন্যে করা গর্জেস মেকভারের সাথেও কিন্তু এখন যোগ হয় ভ্যালু এডিশনাল ট্যাক্স(vat). তাই এখানেও অর্থ এবং নীতি এই দুয়ের পরিনয়.
ফ্যাশন হাউসগুলোর জনপ্রিয়তা বৃদ্ধির পাশাপাশি বেড়েছে সাধারণের স্টাইল বিষয়ক সচেতনতা. আর বিয়ের মৌসুমগুলোতে রেগুলার ক্লোদিন্গের সাথে স্টোর গুলোতে চাহিদা থাকে ব্রাইডাল এটায়ার অর্থাত বিয়ের পোশাকের. ডিজাইনার শাড়ি, ঘাগরা, লেহেঙ্গা, শেরোয়ানি, পাঞ্জাবি, স্যুট, ড্রেস প্যান্ট এবং সব কিছুর জন্যে একসেসরিস সহ তাই অতিরিক্ত আয়োজনও করতে হয় ফ্যাশন প্রডাকশন হাউস গুলোকে. আর এর সাথেই সামগ্রিক অর্থনীতিতে বাড়তে থাকে প্রভাব. বিশেষ করে ফ্যাব্রিক, থ্রেড, টেইলর, অরনামেনটেশন, প্রিন্টিং সহ ফ্যাশন প্রডাকশন কার্যে জড়িত সকল উপকরণ এবং কাজের সাথে জড়িত থাকে অর্থ ও রাজস্ব. আর বিয়ের মৌসুমের ক্লদিং প্রস্তুতি ধর্মীয় উত্সব থেকে খুব একটা কম হয়না. সুতরাং কাপড় উত্পাদনকারী থেকে শুরু করে ফ্যাশন স্টোর পর্যন্ত প্রতিটি পদক্ষেপেই পড়ে কাজের অতিরিক্ত চাপ. যার ফলে অতিরিক্ত উপার্জন এবং বাড়তি ব্যবসার সম্ভাবনা থাকে প্রচুর. এবং এই বাড়তি পোশাক আয়োজন শুধু বর-কনের পোশাককে ঘিরে থাকেনা. বরং সম্প্রসারিত হয় আত্মীয় স্বজন, বন্ধু বান্ধব এবং অতিথিদের পোশাক পর্যন্ত. বিয়ের নিমন্ত্রণ রক্ষায় নতুন পোশাক পড়তে চান না এমন উদাসীন কয়জনই আছে বলুন.
পোশাক চাহিদার ব্যাপারটি আসলে বিয়ের সময় মৌলিক বস্ত্র চাহিদার মাত্রা ছাড়িয়ে যায়. এবং তার সাথে সমান্তরাল বা ব্যক্তি বিশেষে অগ্রগামী হিসেবে বাড়ে গহনার চাহিদা. আর স্বর্ণ নামক ধাতুর সাথে দেশীয় অর্থনীতির সম্পর্ক বেশ পরিপূরক. এবং ক্রয়কৃত স্বর্ণ সম্পদের অংশ হিসেবে বিবেচ্য হওয়াতে ব্যক্তিগত আর্থিক অবস্থারও ঘটে পরিবর্তন. হর-হামেশাই আমরা পত্র পত্রিকায় অবশ্য দেখি স্বর্ণের দামের বৃদ্ধির কারণে কি পরিমান টেনশন বাড়ছে. তবে বিয়ের মৌসুমে স্বর্ণ ব্যবসাকে কেন্দ্র করে অনেক খানিই পাক খেতে হয় বিয়ে অর্থনীতির চাকা কে. অবশ্য শুধু স্বর্ণ নয়, বাকি ধরনের গহনা এবং ধাতুর বাজারেও এসময় লেগে থাকে ভোক্তা এবং ক্রেতাদের ভিড়. বিয়ের ঐচ্ছিক প্রথা অনুযায়ী প্রদেয় গহনা, উপহার হিসেবে গহনা এবং পোশাকের মত অনুষ্ঠান উপলক্ষে অতিথিদের ক্রয়কৃত গহনা মিলিয়ে তাই বেশ বড় অঙ্কের গহনা বিষয়ক আর্থিক লেনদেন ঘটে বিয়ের মৌসুমকে কেন্দ্র করে.
গহনা, পোশাক কেনার পরেও আসলে আপনি বাজেট ফাইল ক্লোস করতে পারবেন না. এই আধুনিক সময়ে পোশাক এবং গহনা পরিয়ে কনে রূপে সাজিয়ে দেবার জন্যেও রয়েছে সালন সার্ভিস. যেখানে বিয়ের সাজের পাশাপাশি পরিনয় পূর্ব রূপ চর্চারো ব্যবস্থা থাকে নির্ধারিত চার্জের বিনিময়ে. এবং এই মেকওভার প্রক্রিয়াতে জড়িত থাকে বিউটি ইন্ডাস্ট্রির নানান দিক গুলো. বিউটি প্রডাক্ট, সার্ভিস চার্জ, সালন মেইন্তেনেন্স মিলিয়ে এই প্রক্রিয়াতেও রয়েছে অর্থ বিষয়ক বিভিন্ন সংশ্লিষ্টতা. বিউটি ইন্দ্রাস্তিয়ালিস্টদের মতে একটি স্ট্যানডার্ড বিউটি সালোনের(ব্রাইডাল সার্ভিস সহ) বার্ষিক টার্ন ওভার বিয়ের মৌসুমে বাড়তে পারে ২০ শতাংশ পর্যন্ত. এমনকি যাদের শুধু ব্রাইডাল মেকওভার সাধারণের কাছে জনপ্রিয় তাদের এই টার্ন ওভার বাড়তে পারে ৪০ শতাংশ পর্যন্ত. এবং অবশ্যই এই প্রক্রিয়ার সাথে জড়িত প্রডাক্ট, সার্ভিস এবং বানিজ্যিক দিক গুলো. এবং সব কিছুই দায় বদ্ধ রাজস্ব এবং করের বিভাগে. সুতরাং বিয়ের সাজ পোশাককে নিয়ে অর্থনীতিতে রয়েছে একটি বড় অধ্যায়. যাকে আমরা বলতে পারি ইকনমি অফ গ্ল্যামার.