সীজন অফ ওয়েডিং, অফ-সীজন ওয়েডিং

প্রকৃতির চরিত্র পরিবর্তনের অন্যতম প্রকাশ মৌসুম বা ঋতু. এই মৌসুমের পরিবর্তনে পাল্টে যায় পরিবেশ, আবহাওয়া, খাবার, পোশাক-আশাক মিলিয়ে জীবনযাত্রার প্রায় সব কিছুই. তবে প্রকৃতির এই মৌসুম ছাড়াও আমাদের লাইফ স্টাইলের ক্যালেন্ডারে রয়েছে আরো বেশ কয়েকটি মৌসুম. যেমন ধরুন ঈদ মৌসুম বা বিয়ের মৌসুম. এই মৌসুম গুলো আসলে যতটুকু প্রকৃতি দ্বারা প্রভাবিত, তার চেয়ে বেশি সময় এবং অভ্যস্ততা দ্বারা নিয়ন্ত্রিত. তাই এই মৌসুম গুলোকে ঘিরে পরিকল্পনা গুলোতে প্রকৃতির সাথে দ্বন্দ থাকলেও অভ্যস্ততার কারণে তা মেনে  নিতে হয় অনুষ্ঠানগুলোতে অংশগ্রহণকারী সবাইকেই. অবশ্য এমনটি হরহামেশাই হয়ে থাকে বিনোদনধর্মী চলচ্চিত্র গুলোতেও. যেখানে তুন্দ্রা অঞ্চলের মনোরম লোকেশনে অভিনেত্রীদের দেখা যায় হট-প্যান্ট আর টর্ন টি শার্ট পরে রক এন্ড রোল করতে, বা মরুভূমিতে একশন হিরোকে দেখা যায় ভার্সাচি সুট পরে হিরোইনের সাথে খুনসুটি করতে. আমরা অবশ্য অভ্যস্ততার কারণেই মেনে নেই. কারণ নায়ক-নায়িকার পোশাক তো এমনি হবে. এই অভ্যস্ততার কারণেই আবহাওয়ার থার্মোমিটারে সর্বোচ্চ তাপমাত্রার সময়েও বিয়ে বাড়িতে বসে গরুর মাংশ চিবুতে চিবুতে ভাবি, বাহ এই না হলে বিয়ে বাড়ির খানা. আবার পারদ হিমাঙ্কের নিচে থাকা সময়ের বিয়েতে এয়ার কন্ডিশন কনভেনশন সেন্টারে গিয়ে স্লিভলেস ব্লাউজের প্রশংসাও শুনি হালকা কেপে কেপে. আর রাতের ঠান্ডা-জ্বর? সেতো হাই ফ্যাশনের অপরচুনিটি কস্ট. আমাদের এমন বিচিত্র মজার অভ্যাস এবং সঠিক পরিকল্পনার অনভ্যাস নিয়েই কিন্তু বেশ চলে যাচ্ছে. আর আমরাও অভ্যস্ত এই মনোভাব নিয়ে যে, ‘চলছে তো…চলুক’.
বিয়ে-সাদির ব্যাপারে আমাদের সংখ্যা গরিষ্ট সাধারণ উপযুক্ত মৌসুম মনে করেন শীতকে. আর তাই অক্টোবর থেকে ফেব্রুয়ারী পর্যন্ত সময়টিকে ধরা হয় ব্রাইডাল সিজন হিসেবে. অবশ্য অফ সিজনে যে বিয়ে হয়না এমন নয়. তবে সংখ্যায় কম. কিন্তু বেশ উচ্চবিত্ত এবং সৃজনশীল সৌখিন মানুষদের বিয়ের অনুষ্ঠান গুলো ছাড়া বেশির ভাগ বিয়ের অনুষ্ঠানগুলোই হয় গতানুগতিক আয়োজন নিয়ে. কিন্তু একটু সচেতন ভাবে পরিকল্পনা গুলো করলেই কিন্তু অনুষ্ঠান গুলো হয় আরামপ্রদ এবং সুবিধাজনক. কিন্তু কিভাবে করবেন একটি ফ্ললেস ব্রাইডাল ইভেন্ট? কয়েকটি কি পয়েন্টে নজর রাখলেই তা সম্ভব.
ফুড ম্যেনু: সিজন হোক বা অফ সিজন হোক, বিয়েতে ভরপুর ভুরিভোজ হবে এটাই স্বাভাবিক. কিন্তু তার পাশাপাশি আমন্ত্রিত অতিথিদের স্বাস্থের ব্যাপারে খেয়াল রাখাটাও বাঞ্চনীয়. তাই বিয়ের ফুড ম্যেনু নির্বাচনের সময় খেয়াল রাখবেন বিয়ের সময় আসলে আবহাওয়া কেমন থাকবে? এবং সেই আবহাওয়ার কারণে কি ধরনের খাদ্যাভাস হতে পারে আমন্ত্রিত অতিথিদের. অভ্যস্ততার বশবর্তী হয়ে তালিকায় রিচ ফুডের উল্ল্যেখ করলেও চেষ্টা করুন একটু মৌসুমী সবজি জাতীয় আইটেম এবং সহজপাচ্য রেসিপি রাখার. এতে করে হেভিওয়েট ডাইনিং হলেও শরীর সচেতন সবাই নিজের মত খাবার পছন্দ করতে পারবেন. যেমন প্রচন্ড গ্রীষ্মের সময়ে অতিরিক্ত তৈলাক্ত খাবার একটু এড়িয়ে চলায় ভালো. আবার বর্ষার সময় মাছ ঢুকিয়ে দেয়া যেতে পারে গরু-খাসির বদলে. আবার বর্ষার সময় একটু ভাজা ভুজি রাখতে পারেন ব্রাইডাল ম্যেনুতে. এমনকি শরবত মেন্যুতেও মৌসুমী ফলফলাদির রস সংযুক্ত করা যেতে পারে একটু নতুনত্ব আনার জন্যে. এছাড়াও বরের টেবলের আস্ত রোস্ট দেয়ার ব্যবস্থা করলে সেটিও কিন্তু কতটুকু অংশ হাফ কুকড এবং কতটুকু ওভার কুকড তা নজর রাখা জরুরি. এমনকি মৌসুম বুঝে মজার মজার সালাদ আইটেমও বিয়ের সুপার রিচ খানা হজম করতে হতে পারে সহায়ক. আসলে খাবার-দাবারের ব্যাপারে শুধু প্রয়োজন স্বাস্থ্য সচেতনতা এবং রসনা বিলাসী. তাহলেই মৌসুম অনুযায়ী ফুড প্ল্যানিং করা যেতে পারে বিয়ের আসরের জন্যে. হাজার হোক বিয়ের খানা বলে কথা.
ওয়েরড্রব: শুধু কি ঝলমল করলেই হবে? ফাংশনালিটির দিকগুলো ভেবে পোশাক নির্বাচন করুন. বিয়ে উপলক্ষে বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই ভারী পোশাকের দিকেই পাল্লা ঝুকে যায়. কিন্তু তা কি সব মৌসুমেই আরামদায়ক কি না আবার ফ্যাব্রিকটি ত্বকবান্ধব কিনা তা বোঝার দায়িত্ব কিন্তু যারা পোশাক নির্বাচন করেন এবং যারা পোশাকটি পরে পুরো বিয়ের অনুষ্ঠানটিতে অংশগ্রহন করেন তাদের উপরই থাকে. এমন কিন্তু কখনই নয় যে গরমের জন্যে হালকা ফ্যাব্রিক দিয়ে বিয়ের পোশাক তৈরী করা যায় না. তবে এক্ষেত্রে দরকার হয় শুধু একটু সময় আর যথাযথ পরিকল্পনা. অথবা গতানুগতিক সব বিয়ের মতই আপনাকেও সাড়ে ১২ কেজি ওজনের শাড়ি-লেহেঙ্গা পরে অনুষ্ঠান শেষ হবার আগেই ঘেমে নেয়ে সব কিছু ঘামাঞ্জলি দিয়ে দিতে হবে. বরের পোশাক এবং বরযাত্রীর সুট-বুটের ক্ষেত্রেও অনেকটা একই সূত্র. বিশেষ করে গরমের দিনগুলোতে ভারিক্কি ডিজাইনের শেরওয়ানির চাপে বরের অবস্থা মাঝে মাঝেই হয়ে ওঠে গলদঘর্ম. আবার হলুদের পোশাকের ক্ষেত্রে অনেকেই গ্রীষ্ম কালে বেছে নেন সিল্ক বা সম জাতীয় ফ্যাব্রিক. এবং হলুদের হৈ হুল্লোর আর কাজ কর্ম করতে করতেই ফ্যামিলি পিকচারে দেখা যায় প্রায় সবারই পাঞ্জাবি ঘেমে লেগে আছে গায়ের সাথে. তাই বিয়ের অনুষ্ঠানের সময় নির্বাচন হবার সাথেই সাথেই সেই মৌসুম অনুযায়ী ফ্যাব্রিক এবং অর্নামেনটেশন ডেনসিটি বাড়িয়ে-কমিয়ে পোশাক নির্বাচন করুন. পাশাপাশি গয়নার ব্যাপারটিও মাথায় রাখতে হবে. কারণ পোশাকের ফ্যাব্রিকের মতই গয়নাও অনেক সময় ত্বকের ক্ষতির কারণ বা অস্বস্তিকর হতে পারে. তাই এসব ডিটেইলিংএর দিকে নজর রাখুন. আর একান্তই না পেরে উঠলে অভ্যস্ততার অজুহাত তো আছেই.
মেকওভার: প্রতিষ্ঠিত এবং প্রশিক্ষিত মেকওভার সালনগুলো ছাড়া এখনো বিয়ের মেকাপ মানেই ত্বকের ওপর রূপের পরত. তাও কিনা আবার যথেচ্ছা ফাউন্ডেশন এবং পাউডারের তৈরী. অল থ্রু দা সিজন ক্ষতির পাশাপাশি ভুল মৌসুমে ভুল মেকওভার এবং বিউটি প্রডাক্ট ব্যবহার আপনার ত্বকের জন্যে বয়ে নিয়ে আসতে পারে বিশেষ বিপর্যয়. গ্রীষ্মকালে যেমন অয়েল বেসড মেকাপ এবং প্রডাক্ট ব্যবহার করলে বিয়ের পরদিন থেকেই আপনার ত্বক হয়ে উঠতে পারে দানাদার. এছাড়াও গ্রীষ্মকালে প্যানকেকের বদলে অতিমাত্রায় ফাউন্ডেসনের অতিমাত্রায় ব্যবহারে ত্বকের অনেক ধরনের ক্ষতি হতে পারে. এবং গরমের দিনে ওয়াটার বেসড মেকাপের বদলে অয়েল বেসড মেকাপ ব্যবহারের সবচাইতে বড় ঝুকি অনুষ্ঠান শেষ হবার আগেই গরমে মেকাপ গলে যাওয়া বা ছড়িয়ে যাওয়া. এমনকি শীতের সময়ও রুক্ষ ত্বকের ওপর মেকাপ সঠিক ভাবে না বসলে কিছু না কিছু বেগতিক ঘটে যেতে পারে. এছাড়াও শীতের সময় যেমন মেকাপ রিমুভিন্গের ক্ষেত্রে একটু বেশি ময়শ্চারাইজার ব্যবহার করা ভালো ঠিক তেমনি গরমের সময় মেকাপ রিমুভিন্গের ক্ষেত্রে ওয়াটার বেসড প্রডাক্ট ব্যবহার করা তা ভালো. চুল বাধা এবং চুল খোলার ক্ষেত্রেও এই পরামর্শ এবং সচেতনতা গুলো একটু মেনে চলতে হবে. মৌসুমের ওপর নির্ভর করে তাই নির্ণয় করতে হয় রূপচর্চার যেকোনো পন্থা.
হেলথ: যেমন ত্বকের সংবেদনশীলতা ঠিক তেমনি আপনার স্বাস্থ্যও ঋতু বৈচিত্রের উপর নির্ভর করে হয়ে ওঠে অনুভুতিপ্রবন. এবং বিয়ের যজ্ঞে সবচেয়ে বেশি যা পোড়ানো হয় তা হলো আপনার স্বাস্থ্য. তাই মৌসুম অনুযায়ী খেয়াল রাখুন নিজের প্রতি নিজের বিয়ের দিনগুলোতে. শীতে যাদের ডাস্ট এলার্জি বা এস্থেমার সমস্যা হয় তাদের জন্যে দরকার বাড়তি সচেতনতা. আবার অতিরিক্ত গরমের কারণে হিট স্ট্রোক করে কনে মূর্ছা গেলে কিন্তু ভাববেন না যে পিতৃকুল ছেড়ে যাবার শোকে এই ঘটনা. তাই গ্রীষ্মকালের এইসব উপসর্গ বা স্বাস্থ্যগত সম্ভাব্য জরুরি অবস্থা যাতে না আসে, সেই দিকে নজর রাখুন. এছাড়াও মৌসুম পরিবর্তন এবং বিয়ের ঝক্কি-ঝামেলার মাঝখানে সচেতন থাকুন স্বাস্থের প্রতি.
এসব কিছু ছাড়াও বিয়ে আয়োজনের প্রায় সবগুলো দিকই কিছুটা হলেও মৌসুম নির্ভর করে পরিকল্পনা করাটা সম্ভব. এবং তা আপনার জন্যে সবসময়ই ভালো ফলাফল বয়ে নিয়ে আসবে. জীবনের সবচেয়ে আকর্ষনীয় উত্সবের মৌসুমে উত্ফুল্ল থাকুন. আর জীবনসঙ্গীকে সব মৌসুমেই সমান ভালোবাসুন.

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *