ওয়েডিং ফ্যাশন

ব্যক্তিজীবনের সবচাইতে বড় উত্সব ‘বিয়ে’র পোশাক আয়োজনকে ঘিরে সবারই রয়েছে নানাবিধ চিন্তাভাবনা. তবে এর সিংহভাগই আবর্তিত হয় পোশাক পরিধানের অর্থমূল্য আর আভিজাত্য প্রদর্শনীকে ঘিরে. তবে এর পাশাপাশি পোশাকটি সঠিকরূপে উপস্থাপন করার কৌশলের অভাবে কিন্তু ভেস্তে যেতে পারে পোশাক আয়োজনের সব চাল. মানব সভ্যতায়  পোশাক পরিধানের সর্ব প্রথম উদ্দেশ্য সফলতা লাভ করে যখন তা মানবজাতিকে মুক্ত করে লজ্জা নিবারণের দায় থেকে. ধীরে ধীরে পোশাক চলে আসে মৌলিক চাহিদার তালিকার দ্বিতীয় স্থানে. আর আজকের যুগে পোশাক পরিধানের রীতিনীতি নির্ধারণের জন্য অবতরন হয়েছে নতুন ধারার. যার নাম ফ্যাশন. প্রশ্ন জগতে পারে, কাপড় পরার জন্য আবার নিয়ম নীতিমালার কি প্রয়োজন? কিন্তু কাবুলী সালওয়ার এর সাথে ফুল স্লিভ ফর্মাল শার্ট পরে একদিন বাইরে বেরুলেই বুঝতে পারবেন কেন এই নিয়ম নীতি. ঠিক তেমনি বিয়ের পোশাকের ক্ষেত্রে অনেকেই করে বসেন এমন অসামঞ্জস্যতাপূর্ণ ভুল. আসলে এগুলোকে ভুল বললে খানিক ভুলই হবে. বরং উত্সব আয়োজনে এগুলোকে বলা যেতে পারে বেখেয়ালী. আর সচরাচর বিয়ের পোশাকের ক্ষেত্রে পাত্র-পাত্রীর চিন্তাভাবনার চেয়ে অভিভাবকদের সিদ্বান্তই একটু বেশিই  গুরুত্ব পেয়ে থাকে. আর এই পরিপ্রেক্ষিতে খুবই স্বাভাবিক প্রক্রিয়াতে (প্রজন্ম ঘটিত দুরত্ব) বরের ‘সুপার সফিস্টিক’ ব্যক্তিত্বের সাথে যোগ হয় ম্যাচিং জরি-চুমকি দেয়া চুনরি আর ঝালরওয়ালা পাগড়ি. অথচ একটু খেয়াল করলেই কন্ট্রাস্ট ম্যাচ করা একরঙা হাতে বাধা পাগড়ি আর ডাবল লেয়ার টিস্যু চুনরি এনে দিতে পারত বরের পোশাকে সিম্পলিসিটি আর সোবারনেস. এসব অনেক কিছু মিলেই আসলে পোশাকে আসে পরিপূর্ণতা. আর জীবনের সবচেয়ে বড় আয়োজনের দিনে যদি পোশাক পূর্ণাঙ্গতা না পায়, অপরপক্ষ থেকে যে মধুর কটুক্তি আসবেনা এ নিশ্চয়তাও কে দেবে বলুন.

পোশাক পরার ক্ষেত্রে সবচাইতে মুখ্য উদ্দেশ্য হিসেবে মোটামুটি সবাই বিবেচনা করেন নিজস্ব ফ্যাশন স্টেটমেন্টর প্রকাশ ঘটানো. আর তা যদি হয় নিজের বিয়ের আসর তাহলে তো কথাই নেই. তবে এই স্টেটমেন্ট প্রকাশের ক্ষেত্রে নিজের দৈহিক গড়ন, গায়ের রং, উচ্চতা, ব্যক্তিত্ব ইত্যাদি সবকিছুকে মাথায় রেখে পোশাক নির্বাচন করাটা খুবই জরুরি. বিশেষ করে বিয়ের পোশাক গুলোর ক্ষেত্রে আরামের দিকটি বিবেচনা করে আউটফিট গুলো পছন্দ করা উচিত. কারণ বিয়ের প্রতিটি অনুষ্ঠানেই বর বা বধুকে বেশ অনেক সময় ধরেই বসে থাকতে হয়. আর এমতাবস্থায় যদি পোশাকটি আরামপ্রদ না হয় তাহলে বিয়ের অনুষ্ঠানের অভিজ্ঞতা মোটেই পারফেক্টলি প্লেস্যান্ট হবেনা. যেমন হলুদের পোশাকের কথাই ধরা যাক, হলুদ মানেই গায়ে হলুদ মাখা তো আছেই, উত্সবের উত্তেজনায় আজকাল স্টেজএ থাকা কেকএর ক্রিম ও চলে আসে বর বা বধুর গালে (ক্ষেত্র বিশেষে পোশাকেও). তাই হলুদের পোশাকের ক্ষেত্রে খুব জমকালো পোশাক না নির্বাচন করাই ভালো. আর রং এর ক্ষেত্রে হলুদের রং লেগে গেলেও তা যাতে ক্যামোফ্লেজ হয়ে থাকে এমন রং নির্বাচন করা উচিত. আরামের ব্যাপারটিত মাথায় থাকতেই হবে, যেহেতু হলুদের পিরিতে ঘন্টার পর ঘন্টা বর বা বধুকে বসে থাকতে হয়. তবে এক্ষেত্রে ব্যাপারটি একটু সহজ হয়ে যায় যদি মৌসুম কে মাথায় রেখে পোশাকের ফাব্রিক নির্বাচন করা সম্ভব হয়. নতুবা প্রচন্ড গরমে মোটা ফেব্রিক পরে ঘেমে নেয়ে ওঠার মত পরিস্থিতির শিকার হতে হবে অথবা হিম শীতলে আবহাওয়াএ পাতলা ফ্যাব্রিকের কাপড় পরে শ্বশুর বাড়ির লোকদের সামনে কাঁপতে হবে. বরের হলুদের পোশাকের ক্ষেত্রে একটু ঢিলেঢালা গোছের পাঞ্জাবি অথবা শর্ত কুর্তা হতে পারে আদর্শ পোশাক. সাথে মানানসই সালওয়ার. যারা একটু স্বাস্থ্যবান তারা কাবুলী সালওয়ার পড়তে পারেন সাথে একটু লুস ফিট কুর্তা বা পাঞ্জাবি. চুনরি বা ওরনা আসলে হলুদের ক্ষেত্রে একটু ঝামেলার অবতরণ করতেও পারে. তাও যদি আপনি নিজে ম্যানেজ করে নিতে পারেন তাহলে তো কথাই নেই. মেয়েদের ক্ষেত্রে সাধারণত এক প্যাচ এ শাড়ি পরার একটা চল আমাদের দেশে রয়েছে. তবে এক্ষেত্রে ইজি মেইন্টেনেনস এর জন্য ফ্যাব্রিক খুবই জরুরি একটা ফ্যাক্টর. হাফ সিল্ক বা মার্সেরায়জ্দ কটন খুবই চমত্কার সমাধান হতে পারে. তাহলে আপনার শাড়ি ফুলে থাকবেনা. আর যারা নতুনত্ব আনতে সালওয়ার-কামিজ পড়তে চান তাদের জন্যও রয়েছে পছন্দসই কাপড় বেছে নিয়ার সুযোগ. আর শাড়ির তুলনায় সালওয়ার-কামিজ বেশি ফ্লেক্সিবল, তাই হঠাত উঠে নাচানাচি শুরু করে দিলেও খুব একটা সমস্যাএ পড়তে হবেনা. হলুদে সচরাচর ফুলের গহনার জনপ্রিয়তা এখন তুঙ্গে. কিন্তু পোশাকের সাথে ম্যাচিং করে গহনা গুলো কেনা উচিত. তবে খেয়াল রাখতে হবে যাতে আলগা কাঁটা বা তার না থাকে.

একটু আনন্দময় হলুদের পরেই বিয়ের দিনটি চলে আসে. তবে এক্ষেত্রে বরের পোশাকের ব্যাপারে স্বয়ং বর খুব একটা মাথা ঘামাতে পারেন না. কারণ পোশাক আসে কনের বাড়ি থেকে. তবে আজকাল এই নিয়মের বেশ বিবর্তন দেখা যাচ্ছে. তাই যদি সুযোগ থাকে তাহলে এই যুগের নওশেররা অতিরিক্ত চুমকীয়ালা শেরওয়ানি বা পাঞ্জাবি এড়িয়ে যেতে পারেন. কারণ আমাদের দেশের গতানুগতিক বিয়ের শেরওয়ানি গুলো হয় এক ছাট এর. যা বসার সময় সামনের অংশ ফাক হয়ে যায়. কিন্তু শেরওয়ানিটি একটু ঘেরওয়ালা হলেই এই ঘটনা থেকে সহজেই মুক্তি পাওয়া সম্ভব. সাথে চুরিদার(শেরওয়ানি হলে অবশ্যই চুরিদার) বা সালওয়ার বাছাই করা উচিত একই রং এর. খেয়াল রাখবেন যাতে পকেট ও জিপারওয়ালা পায়জামা হয়. নতুবা জরুরি সময় জরুরি অবস্থার সম্মুখীন হতে হবে. যদিও আমাদের দেশের বরের পোশাক হিসেবে চুরিদার আর চুমকীয়ালা শেরওয়ানি প্রথা হয়ে যাচ্ছে কিন্তু বেশিরভাগ সময় অনেকেই খেয়াল করেন না যে নিজের সাইজ থেকে অন্তত দুই সাইজ বড় শেরওয়ানিতে আসলে কেমন লাগছে. তবে এর একমাত্র সমাধান কাস্টমাইজদ ফিটিং. যদি নিজের পছন্দ মতন বানানো হয় তাহলে তো কথাই নেই. অথবা আপনি কোনো ফ্যাশন স্টোর থেকে কিনে অল্টার করে নিতে পারেন অনায়াসেই. এর সাথে যদি কেউ চুনরি বা ওরনা ব্যবহার করতে চান একসেসরিস হিসেবে তাহলে টিস্যু এবং কন্ট্রাস্ট রং ব্যবহার করতে পারেন. আর শ্যালক শ্যালিকার টার্গেট থাকে যেই জুতোর প্রতি, অনেকে নিজের সুবিধার্থে তা পরেন মুজা দিয়ে. ব্যাপারটি সহনশীল হলেও চোখে যে একদম ই লাগেনা এমন নয়. আসলে নাগরার মত এক খানা রাজসিক জুতা কখনো মুজা দিয়ে পরা উচিত নয়. যাই হোক সব শেষে আসে বরের পাগড়ির কথা. আমাদের দেশের গতানুগতিক (এলিফ্যান্ট রোড কেন্দ্রিক ব্রাইডাল স্টোর গুলোতে সহজলভ্য) যেসব পাগড়ি পাওয়া যায় তা খুব কম সময় ই বরের মাথায় পারফেক্ট ফিট হয়ে থাকে. হয় শশুর মশায় কে সালাম করতে গিয়ে তা খুলে আসার উপক্রম হয় অথবা তা এত টাইট থাকে যে বাসর রাতে নব বধুকে মাথা মালিশ করে দিতে হয়. এই ঝামেলা এড়ানোর সবচেয়ে সহজ পন্থা হলো হাতে বাধা পাগড়ি পরা. একাধারে টা আপনার মাথায় ফিট হবে ঠিক তেমনি আপনার স্টাইল স্টেটমেন্ট কে নিয়ে যাবে হিরোইক  পর্যায়ে.

বিয়ের কনের পোশাকের ক্ষেত্রে আলোচনা আসলে খুবই সংবেদনশীল একটা ব্যাপার. শাড়ির পাশাপাশি আজকাল অনেকেই লেহেঙ্গা বা ঘারারা পরে থাকেন. তবে গহনার আতিশয্য সবসময় ই কনের পোশাকের উপরি অংশ আবৃত করে রাখে. ঘটনা টি ‘unavoidable’. কিন্তু গহনার ম্যাচিং এর ব্যাপারটির চেয়ে বেশিরভাগ সময়ই আতিশয্যই প্রাধান্য পায়. যাই হোক, গহনার ক্ষেত্রে এর নন টক্সিসিটির ব্যাপারটিও বেশ গুরুত্বপূর্ণ. তবে কনের পোশাকের ক্ষেত্রে সবচেয়ে মুখ্য বিষয়টি হচ্ছে পোশাকের ফিটিং. এক্ষেত্রে ট্রায়াল দেয়া ছাড়া আর কোনই বিকল্প নেই. আর সবচেয়ে রিস্ক ফ্রী কাজ হচ্ছে কনের মাপ নিয়ে পোশাকটি বানানো.

পোশাক তৈরির সাথে সাথে এর প্রেসেন্টেশনও একটি অবশ্য লক্ষ্যনীয় ব্যাপার. অনেক গর্জিয়াস একটি পোশাক ও নেহাত পরিবেশনের দোষে সস্তা (সৃজনশীলতা বিচারে) মনে হতে পারে. তাই সঠিক পরিবেশন কল্পে খেয়াল রাখতে হবে যেন ম্যাচিং এর আতিশয্য যেন না হয়ে যায়. যেমন লেহেঙ্গা বা করসেট টপস অথবা চোলির ক্ষেত্রে এমন ফ্ল্যাশি কিছু পরবেন না যাতে আপনার গহনার ঔজ্জল্য পোশাকের আড়ালে ঢেকে যায়. পোশাকের ওজনের ব্যাপারটিও বিয়ের দিনকার জন্য খুবই উদ্বিগ্নতার দাবিদার. অথচ হালকা ফ্যাব্রিকের পোশাক বিয়ের দিনটিতে আপনাকে এনে দিতে পারে সাচ্ছন্দ্য.

পোশাক বির্বাচন এবং তা পরিবেশনের মাধ্যমেই প্রকাশ পায় আপনার ব্যক্তিত্ব আর রুচির বৈচিত্রের. আর বিয়ের মতন আনুষ্ঠানিকতা যাতে সর্বদা স্মরণীয় থাকে তার জন্যে এই দুটি বিষয়ের দিকে লক্ষ্য রাখার দ্বিতীয় কোনো অপশন পাওয়া দুষ্কর.

 

 

নুরুল আফসার রাজ

 

Leave a Reply